মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মাজার শরীফ

দক্ষিণ মরফলা বারেক শাহ্‌ মাজার

 

 

 

 

প্রশ্ন: ওলি-আউলিয়ার মাজার পাথর দিয়ে বাঁধানো কিংবা তার উপর মাজার নির্মাণ করা যাবে কি-না? এ ছাড়া, খানকা’তে মানতের খাবার বিতরণ করা যাবে কি?

উত্তর: কবর পাথর দিয়ে বাঁধানো, ঐ পাথরের উপর লেখা এবং কবরের উপর স্থাপনা নির্মাণ করা আলেম ও ফকীহদের দৃষ্টিতে জায়েজ। নবী-রাসূল, ইমাম, ওলি-আউলিয়া ও সত্‌ ব্যক্তিদের কবরের উপর স্থাপনা নির্মাণ করার ফলে ইসলামের মহান ব্যক্তিদের সম্মান বেড়ে যায় বলে এগুলো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইসলামের মহান ব্যক্তিদের কবরের উপর মাজার নির্মাণ করার প্রচলন ইসলামের শুরু থেকে ছিল এবং এখনও তা বহাল রয়েছে।

আর মাজার বা খানকা’তে মানতের খাবার বিতরণে বাধা নেই। তবে মানত ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে নিচের শর্তগুলো পূরণ হওয়া জরুরি:

১. মানতকারী ব্যক্তিকে সমার্থ্যবান এবং বিবেকবান হতে হবে।

২. কেউ মানত করতে তাকে বাধ্য করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

৩. এমন কাজের মানত করা উচিত যা তিনি পালন করতে পারবেন।

৪. ব্যক্তি যে কাজ করার জন্য মানত করেছে তা যেন ইসলামে হারাম না হয়।

 

কবর পাথর দিয়ে বাঁধানোর ব্যাপারে (শ্রোতাদের অনুরোধে) দলিল-প্রমাণ ও রেফারেন্স দেয়া হল :

 

প্রথমত:  সুরা আনআমের ১৪৫ নম্বর আয়াতের আলোকে [“(হে নবী!) আপনি বলে দিন : যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে, তার মধ্যে আমি কোন হারাম বা নিষিদ্ধ খাদ্য পাইনি, .....” (৬:১৪৫)] যা কিছু মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ নয় সেসবই বৈধ বলে মনে করেন মুসলিম বিশ্বের আলেম ও ফকিহবৃন্দ। এটি ইসলামী আইনের একটি বড় মূলনীতি। 

 

দ্বিতীয়ত: কবর সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো যদি নিষিদ্ধ হত তাহলে যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত এইসব প্রথার বিরুদ্ধে আলেম ও ফকিহরা প্রতিবাদ জানাতেন। কারণ, আমরা জানি বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র মাজারের ওপর এখনও সুদৃশ্য সবুজ গম্বুজসহ মাজার বা সৌধ রয়েছে।

পবিত্র মক্কায় হযরত ঈসমাইল (আ.)'র মাতা ও হযরত ইব্রাহিম (আ.)'র স্ত্রী বিবি হাজরা'র (সালামুল্লাহি আলাইহার) পবিত্র কবর পাথরে ঢাকা রয়েছে।

ফিলিস্তিনে হযরত ইয়াকুব ও ইব্রাহিম (আ.)সহ বেশ কয়েকজন নবীর পবিত্র মাজার পাথরে ঢাকা রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।

পাথরে ঢাকা রয়েছে সুন্নি মুসলমানদের প্রখ্যাত ইমাম আবু হানিফার ও  সুন্নি বিশ্বে বড় ওলি হিসেবে পরিচিত আবদুল কাদের গিলানি বা জিলানির কবর। তাদের কবরের ওপর মাজারও রয়েছে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।

 

বিশ্বনবী (সা.)'র সাহাবি হযরত যুবাইরের কবর কোথায় ছিল তা কেউ জানত না। আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে জামাল যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে কিছু দূরে একটি কবরে তরবারিসহ পাওয়া একটি লাশকে এই সাহাবির মাজার বলে চিহ্নিত করেন সে যুগের স্থানীয় মুসলমানরা। ওই কবর পাথর দিয়ে বাধাই করা হয় এবং নির্মাণ করা হয় মাজার বা স্মৃতি-সৌধ। এ ব্যাপারে দেখুন সুন্নি বিশ্বে ব্যাপক গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স বই "তারিখে ইবনে কাসির" (১১ তম খণ্ড, ৩১৯ পৃ.) এবং আবুল ফারাজ ইবনুল জাওজির লেখা বই "আল মুন্তাজাম", পৃষ্ঠা-১৮৭। 

 

হযরত আলী (আ.), হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও আহলে বাইতের অন্য সদস্যদের পবিত্র মাজারের ব্যাপারে এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সাহাবি ও আওলিয়া-কেরামের মাজারের ব্যাপারে গত দুই এক শতকের ওয়াহাবিরা ছাড়া মুসলমানদের কেউ কখনও আপত্তি করেনি।

(ইংরেজদের সৃষ্ট ধর্মান্ধ ওয়াহাবি মতবাদ তৈরি করা হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য। তারা সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ায় কয়েকজন সাহাবির মাজার ধ্বংস ও অবমাননায় জড়িত হয়েছে। সৌদি আরবে ওয়াহাবিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আগে ৮০-৯০ বছর আগেও বহু সাহাবি এবং অলি-আওলিয়ার মাজার ছিল হাজারো ও শত শত বছর ধরে।)  

 

তৃতীয়ত: হাদিসে এসেছে সাধারণ মুসলমান মানুষের লাশ যাতে কবর থেকে শিয়াল-কুকুর বা হিংস্র জন্তু উঠিয়ে না ফেলে বা খেয়ে না ফেলে বা কবর থেকে বৃষ্টির ফলে  কিংবা বন্যা ও ভূমি ধ্বসের মত ঘটনার কারণে যাতে লাশ বেরিয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে সে জন্য কবর যথাসম্ভব মজবুতভাবে বাঁধাই করা বৈধ এবং উত্তম।

 

চতুর্থত: ওলি-আউলিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য যখন মাজার বা সৌধ নির্মাণ বৈধ তখন তাঁদের কবর পাথর দিয়ে বাধাই করা অবৈধ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কারণ, এটাও সম্মান প্রদর্শনের অংশ।

কবরের স্মৃতি চিহ্ন রাখার ও  ওলিদের কবরের ওপর মাজার নির্মাণের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। এইসব চিহ্ন বা মাজার মহাপুরুষদের অসামান্য কীর্তি, মহত চরিত্র ও ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাঁদেরকে অনুসরণের প্রেরণা যোগায়। এভাবে সুন্দর ও মজবুত কবর এবং মাজার মু'মিন মুসলমানদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

 

কুরআনের বাণীর আলোকে আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান জানানো কেবল বৈধই নয় তা অতি উত্তম ও মহত কাজ। #


Share with :
Facebook Twitter